যে বাড়িটাতে নানার মৃত্যু হয় সেটা ছিল অনেক সুন্দর গোলাপী রঙএর একটা দোতলা বাড়ি। রঙটা খানিকটা চটে গেলেও রঙ-এর জৌলুসটা তখনও ছিল চোখে পড়ার মতো। একতলার লম্বা নাতিদীর্ঘ করিডরটা যে বারান্দায় উন্মুক্ত হয়েছিল একটি দরজার মধ্যে দিয়ে, সেই বড় বারান্দাটার পাশেই ছিল মোটামুটি বড় একটা উঠোন (যতদূর মনে পড়ে, বারান্দাটা লাল রংএর মোজাইকে আবৃত ছিল; আর বারান্দার প্রান্ত বরাবর চারদিকে কালো রঙ-এর মোজাইকের বর্ডার ছিল – ঠিক শাড়ীর আঁচলের মতো; বাইরের কিনারাগুলো, যেগুলো খাড়াভাবে উঠোনটাতে নেমে এসেছে, মোজাইকের নীচের জমাটবাধা সিমেন্টটাকে দৃশ্যমান করেছিল)। আর হ্যা, ঐ গোলাপী রঙএর দোতলা বাড়িটার একতলায় আমরা ভাড়া থাকতাম। বারান্দাসংলগ্ন উঠোনটার একপাশে, পশ্চিমদিকের সীমানা দেয়ালের ধার ঘেষে একটা মোটামুটি বড় আকারের আমগাছ ছিল। গ্রীষ্মের রোদতপ্ত দিনগুলোতে ঐ গাছের টক-মিষ্টি আম পেড়ে খাওয়াটা ছিল একটা বড় বিনোদন। সেই আম ছুরি দিয়ে নিজেই কাটতাম, কাটার পর আঁটিসহ পাঁচ টুকরা হত; গুরামরিচ আর লবন মেশানোর পর স্তব্ধ রোদেপোড়া দুপুরে সেই আম বাড়ির কোথাও, কোনো নির্জন কোনায় বসে খেতাম। আমের কাঁচাপাকা স্বাদটাই জিভে লেগে থাকত, এই স্বাদের আম এখনকার মতো তখনও খুবই দুষ্প্রাপ্য ছিল – দেখতে কাঁচা আমের মতো, কিন্তু স্বাদে টক-মিষ্টি।
বারান্দাসংলগ্ন উঠোনটায় টমেটো আর বেগুন গাছও লাগিয়েছিলাম। টমেটোগাছগুলোর কথা স্পষ্ট মনে আছে, কারণ তারা সংখ্যায় অনেক ছিল। সারিবদ্ধ গাছগুলোতে ঝুলে থাকা বড় বড় টুকটুকে লাল রং-এর টমেটোগুলো উজ্জ্বল রোদেলা দিনে তপ্ত বাতাসে চমৎকার লাল দ্যূতি ছড়াত, আর তার সাথে বাতাসে মিশে থাকত বেশ খানিকটা উঁচু হয়ে ওঠা আর নাদুসনুদুস টমেটোগাছগুলোর বন্য আর মাদকতাময় এক গন্ধ। এমনই এক উজ্জ্বল রোদেলা দিনে দাড়িয়ে ছিলাম আমার সেই টমেটো ক্ষেতটার ঠিক মাঝখানটায়। তপ্ত বাতাসে চমৎকার লাল দ্যূতি ছড়াচ্ছিল সারিবদ্ধ গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা বড় বড় টুকটুকে লাল রং-এর টমেটোগুলো; আর তার সাথে বাতাসে মিশে যাচিছল লম্বা আর নাদুসনুদুস টমেটোগাছগুলোর সেই বন্য আর মাদকতাময় গন্ধ, – আর এইসব কিছু সম্মিলিতভাবে আমার সারা শরীরে একধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। এর ফলশ্রুতিতে সহসা মাথাসহ আমার সারা শরীর লাল হয়ে যেতে থাকে, আর সেই সাথে সারা শরীরে হতে থাকে সুতীব্র জ্বালা-পোড়া। শরীরের এই আকস্মিক পরিবর্তন-প্রতিক্রিয়ার কারণে খানিকক্ষণের জন্য অত্যন্ত ভীত এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম । বেশ খানিকটা সময় পরে যখন দেহের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এলো, তখন অনেকখানি স্বস্তি পেয়েছিলাম। বেগুনের ফলনও সেই উঠোনে অনেক ভালো হত; ছোট ছোট তরতাজা বেগুনগাছগুলোতে ছোট ছোট, খানিকটা লম্বাটে আর ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল বেগুনী রংএর বেগুনগুলো ঝুলে থাকত – সংখ্যায় টমেটোগুলোর মতো এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না সেগুলোর, তবে প্রতিটি বেগুন স্বাদে ছিল অতুলনীয়; এর একটি কারণ মনে হয় এই যে, সেগুলোকে সরাসরি বাগান থেকে তুলে এনে অনতিবিলম্বে রান্না করা হত।
এই গোলাপী রঙ-এর বাড়িটাতেই আমরা আমাদের প্রাণপ্রিয় পোষা বিড়াল জেকুকে চিরতরে হারিয়েছিলাম। জেকুকে মোহাম্মদপুরের হলুদ রঙ-এর ভাড়া বাড়ি ছাড়ার সময় সাথে করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। সহসা জেকুর জিভ সাদা হয়ে যাচিছল, কোনো খাবার সে খেতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত আমাদের অনেক আদরের বিড়ালটা নির্জীব এবং মৃতপ্রায় হয়ে পড়লে রিঠুভাই বিড়ালটাকে সরকারি পশু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। রিঠুভাই জেকুর মৃতদেহটা নিয়ে বাসায় ফিরে আসে। জেকু আমাদের পরিবারের একজন ছিল, তাকে কখনো আমরা আলাদাভাবে দেখিনি। তাই তার মৃত্যুতে আমরা সবাই – আমার বোন নীরা, আমি, মা, বাবা – শোকে অভিভূত হয়েছিলাম। জেকুকে পরম ভালোবাসার সাথে আম গাছটার ছায়ায় কবর দেয়া হয়। হয়ত আজও তার কঙ্কাল সেই মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে।
গোলাপী বাড়িটার দোতলায় বাবা-মা আর এক সন্তানের ছোট একটা পরিবার থাকত। ছোটখাটো আর কিঞ্চিত ভারিক্কি মহিলাটি বেশ ফর্সা, সুশ্রী আর মিষ্টি চেহারার ছিল। আর তার স্বামীটি ছিল হাবাগোবা ধরনের নিতান্ত ভালো মানুষ টাইপের। তাদের একমাত্র ছোট্ট ছেলেটির নাম ছিল রণি, যার সাথে আমার যথেষ্ট সখ্য গড়ে উঠেছিল। রণি ছবি আঁকতে পছন্দ করত। আমাকেও সেই সময় ছবি আঁকার নেশা পেয়ে বসেছিল। দুজনে মিলে প্রতিযোগিতা দিয়ে ছবি আঁকতাম, যদিও সে ছিল বয়সে আমার আর আমার বোন নীরার চাইতে বেশ খানিকটা ছোট। যদিও স্মৃতিতে অস্পষ্ট, মনে হয় সে সময় কোনো এক আর্ট স্কুলের ছাত্রও ছিলাম। সম্ভবত সেটাই ছিল ছবি আঁকার প্রেরণা। সে সময় আমার আঁকা একটা ছবির কথা স্পষ্ট মনে আছে, বন্যার ছবি ছিল – বন্যার পানিতে গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালা সব ডুবে আছে। স্বাভাবিকভাবেই এমন ছবিতে নীল রং-এর আধিক্য ছিল।
গোলাপী বাড়িটা থেকে খানিকটা দূরেই ছিল প্লেনমার্কা মসজিদ (মসজিদটার শীর্ষদেশে পেটমোটা আর ডিম্বাকৃতির সাদা টিনের তৈরি একটা প্লেন দেখা যেত, যার লেজ আর ডানা দুখানা সবুজ ছিল; প্লেনটার সম্মুখভাগে সাদা টিনের প্রোপেলার-এর মতো একটা অংশও ছিল), আর সেই মসজিদের কাছেই ছিল আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের চেম্বার; চেম্বারটা ছিল একটা ফার্মেসীর ভেতরের দিকে, একটা ছোট কামরায়; কামরাটা ফার্মেসীর অংশ ছিল, যেখানে ফার্মেসীর মালিক তাকে প্রাইভেট প্রেকটিস করতে দিয়েছিলেন মূলত ওষুধের বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। আমাদের পরিবারের যে কারো যে কোনো রকমের রোগবালাই হলে লোক পাঠিয়ে ওনাকে নিয়ে আসা হত। কখন কিভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো ওনাকে নিয়ে আসা হয়েছিল, জানি না; তবে, বারবার আসতে আসতে একসময় উনি আমাদের পারিবারিক ডাক্তার-এ পরিণত হয়। অসংখ্যবার নানাবিধ শারীরিক সমস্যা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তার অপেক্ষায় ফার্মেসীর বেঞ্চিতে বসে থেকেছি। তবে আমাদের ডাক্তারবাবু বলতেন যে, আমার আসলে কোনো শারীরিক সমস্যাই নেই। তিনি আমার মধ্যে কোনো রোগের সন্ধান পাননি কখনো।