একদল সাদা, বাদামী, আর কালো রঙ্গের হাঁস কোনো পুকুর, ডোবা, অথবা জলাশয়ের স্বচ্ছ অগভীর জলে সাতার কাঁটছে এ দৃশ্যটি দেখলে কেন জানি শৈশব অথবা কৈশোরের দিনগুলোর কথা মনে হয়। এই দৃশ্য দুই চোখের পাতায় একটা অদ্ভ‚ত সুন্দর স্বপ্নাবেশ নিয়ে আসে, যেটা ঠিক রূপায়িত নয়, তবে অস্তিত্ববান। ছেলেবেলায় আমার খুব, এবং ঘনঘন, জ্বর হত; বিশেষভাবে এটা হত আবহাওয়া পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে শরৎের মাঝামাঝি অথবা হেমন্তের শুরুতে, সেপ্টেম্বর মাসের কোন এক সময়। সেই জ্বর, সর্দি-কাশি কখনো সখনো অক্টোবর মাস পর্যন্ত গড়াত। ছেলেবেলার সেই জ্বর, একবার হলে, বাড়তেই থাকত ১০১, ১০২, ১০৩ ……. জ্বর বাড়ছে তো বাড়ছেই; আর আমি একা একা একটি নিভৃত, নিস্তব্ধ কামরার একদিকে বিছানায় শুয়ে জ্বরে কাতরাচ্ছি।
জ্বর খুব বেশী বেড়ে গেলে যা করতাম খুব গরম পশমের তৈরী কম্বল দিয়ে শরীর, মাথা সব ঢেকে ফেলতাম; এভাবে বেশ খানিকক্ষণ শুয়ে থাকবার পরে শরীর থেকে বালতি বালতি ঘাম ঝরে জ্বর ছেড়ে যেত; অতঃপর কম্বলের তলা থেকে বেড়িয়ে আসবার পরে শরীর-মন কামরার বাতাসে এমন জুড়িয়ে যেত মনে হত গ্রীষ্মকালে হঠাৎ করেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো কক্ষের ভেতরে জেগে উঠেছি।
শৈশবে যখনই শরীর খুব খারাপ হত, তখনই ডাকা হত আমাদের পারিবারিক ডাক্তারকে। এই ডাক্তারটি এম.বি.বি.এস পাশ করবার পরে পড়াশুনার পথে আর অগ্রসর হননি; আজীবন একই ফার্মেসীর একই চেম্বারে প্রেকটিস করতে করতে অবশেষে শেষ বয়সে অবসর নেন। এর ফলে যা হয়, এক সময় তিনি ওষুধের ডাক্তারে পরিণত হয়েছিলেন। যে সময়ের কথা বলছি সে সময় দেশের মানুষ ”জাতীয় ওষুধ নীতি” কি জানত না; এখনকার সব বাতিল হয়ে যাওয়া ওষুধ শহরের বাজারে দেদারসে বিক্রী হত। প্রতিবারই আমার জ্বর মেপে, এবং অন্যান্য কিছু শারীরিক পরীক্ষার পর তিনি যে সব ওষুধ-পত্র দিতেন তার মধ্যে অতি-অবশ্যই থাকত ফেনসিডিল, ফেনারগেন, আর কাফ-সিরাপের মতো ওষুধ। যতবারই আমার সর্দি-জ্বর, গলা ব্যাথা, কাশি এসব হত ততবারই আমাদের পারিবারিক চিকিৎসকের নির্দেশে আমাকে এসব গিলতে হত। ছেলেবেলায় এই ব্যাপারটি প্রায় নিয়মেই পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে নিজের কন্ঠস্বরের যে জড়তা লক্ষ্য করি তার অন্যতম একটি কারণ এটি হতে পারে বলে মনে হয়। ঘুম-ঘুম, ঝিমুনী-ধরা সেই কন্ঠস্বরে যেন ফেনারগেন, কাফ-সিরাপ আর ফেনসিডিলের গন্ধ মিশে আছে। তবে, এটা আমার মনের ভুল ধারণাও হতে পারে।